চট্টগ্রাম: মিয়ানমারে পাচারের সময় কোস্টগার্ডের জব্দ করা ৪৫০ বস্তা ডিএপি রাসায়নিক সারের মধ্যে ১০০ বস্তা গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম পুলিশ ও কোস্টগার্ডে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ অভিযোগের সূত্র ধরে কর্ণফুলী থানা পুলিশ একটি পিকআপসহ ৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করে পৃথক মামলা দায়ের করেছে।
জানা গেছে, গত ৩১ জুলাই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পতেঙ্গা থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বহিঃনোঙর এলাকায় অভিযান চালায় কোস্টগার্ড। অভিযানে মিয়ানমারে পাচারের সময় দুটি ফিশিং বোট ও একটি কার্গো বোট আটক করা হয়। পরে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের ৪৫০ বস্তা ডিএপি রাসায়নিক সার এবং ১ হাজার ৩৫০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চোরাচালানের অভিযোগে ২৩ জনকে আটক করা হয়।
এ ঘটনায় কোস্টগার্ডের পেটি অফিসার মো. শেখ শরিফ ইকবাল বাদী হয়ে পতেঙ্গা থানায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫বি ও ২৫ডি ধারায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পতেঙ্গা থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীরকে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, কোস্টগার্ডের জব্দ করা ৪৫০ বস্তা সারের মধ্যে প্রায় ১০০ বস্তা গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বিক্রি হওয়া সারের ৫০ বস্তা কর্ণফুলী থানার জুলধা এলাকা দিয়ে সরিয়ে নেওয়ার সময় শাহ মিরপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শফি উল্লার নেতৃত্বে একটি পুলিশ দল পিকআপসহ সারগুলো জব্দ করে।
এ ঘটনায় এসআই শফি উল্লা বাদী হয়ে গত ৩ আগস্ট কর্ণফুলী থানায় সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬ (সংশোধনী-২০১৮)-এর ৮(২) ধারায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় পিকআপ চালক মো. রেজাউল করিম (২৯) এবং পলাতক মনির (৩৫)-কে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি আলামত হিসেবে সংরক্ষিত কোস্টগার্ডের উদ্ধার করা সারের একটি অংশ গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর, ফাঁড়ির দ্বিতীয় কর্মকর্তা এএসআই শম্ভু নাথ, আনোয়ারা রাঙ্গাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ি ও কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জব্দ তালিকাভুক্ত সার থেকে ১০০ বস্তা জুলধা এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়। পরে সেগুলোর মধ্যে ৫০ বস্তা মিনি ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়ার সময় কর্ণফুলী থানা পুলিশ তা জব্দ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, কোস্টগার্ড অভিযানের পর সারগুলো কার্গো বোটেই সংরক্ষিত ছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে গুদামজাত বা হস্তান্তরের আগেই সেখান থেকে সার বের করে বিক্রি করা হয়। এ কাজে পতেঙ্গা থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির এক কনস্টেবলেরও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নাজিবুল ইসলাম তানভীর। তিনি বলেন, “জব্দ করা সার যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। বিক্রির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ আলী বলেন, “জব্দ করা রাসায়নিক সার বিক্রির অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, “৫০ বস্তা সার জব্দের ঘটনায় সার ব্যবস্থাপনা আইনে মামলা হয়েছে। বর্তমানে দুজনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কোস্টগার্ডের অভিযানে উদ্ধার হওয়া সরকারি আলামত কীভাবে পুলিশি হেফাজত থেকে বাইরে গেল—এই প্রশ্নকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্তের দিকে নজর রয়েছে।