পাঁচ বছর পর বাড়ি ফেরার কথা ছিল পুলকের, ২০ দিরহামের বিরোধে আবুধাবিতে ছুরিকাঘাতে মৃত্যু

পাঁচ বছর পর আগামী শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দেশে ফেরার কথা ছিল পরিবারের বড় ছেলে পুলক নাথের (২৫)। দিনক্ষণও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। ছেলেকে বরণ করে নিতে অপেক্ষায় ছিলেন মা, ভাই-বোন ও স্বজনেরা। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর আনন্দে রূপ নিল না। দেশে ফেরার আগেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে রুমমেটের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন পুলক।

বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন পুলক। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে টাকা পাঠাতেন দেশে। তাঁর পাঠানো অর্থেই চলত মা, প্রতিবন্ধী ছোট ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনযাপন। সেই ছেলের আকস্মিক মৃত্যুতে এখন দিশেহারা পুরো পরিবার। যে মা ছেলের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন, এখন তিনিই ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাচ্ছেন।

পুলকের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার জিরি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিবেকানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায়। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির মোছাফফা শহরে নিজ কর্মস্থলে এ ঘটনা ঘটে। মাত্র ২০ দিরহাম নিয়ে বিরোধের জেরে মিশরীয় এক রুমমেট পুলককে ছুরিকাঘাত করেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

ছেলের মৃত্যুর খবর জানাতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা রানী বালা দেবী। কখনো চোখের পানি মুছছিলেন, কখনো নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকছিলেন শূন্যের দিকে। যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, কয়েক দিন পর যে ছেলের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা, সেই ছেলে আর কোনো দিন ফিরবে না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রানী বালা দেবী বলেন, ‘আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল বড় ছেলে পুলক। স্বামী মারা যাওয়ার পর সেই সংসারের হাল ধরেছিল। ছোট ছেলেটাও প্রতিবন্ধী। পাঁচ বছর পর বাড়ি আসার কথা ছিল তার। কত আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। এখন আমার পরিবারকে কে দেখবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘মাত্র ২০ দিরহাম নিয়ে বিরোধের কারণে আমার ছেলেকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে শুনেছি। ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর রাঙ্গুনিয়ায় বসবাসকারী এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর খবর পাই। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমার ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন।’

পুলকের ছোট ভাই অলক নাথও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তাঁর ভাইয়ের কাছে মিশরীয় এক রুমমেট ২০ দিরহাম চেয়েছিলেন। ওই টাকা না দেওয়ায় তাঁর বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয় বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ভাইকে হারিয়ে এখন তাঁরা দিশেহারা।

বোন চুমকি দেবী বলেন, ‘আগামী শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভাইয়ের দেশে আসার কথা ছিল। পাঁচ বছর পর বাড়ি ফিরবে, তাকে নিয়ে কত পরিকল্পনা ছিল আমাদের। ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সে আর ফিরবে না, এটা কখনো ভাবিনি। পুরো পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে গেছে।’

তিনি জানান, ঘটনার খবর পাওয়ার পর চট্টগ্রামে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। ভাইয়ের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

এদিকে পুলকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন। পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।

পাঁচ বছর ধরে প্রবাসে থেকে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছিলেন পুলক। সেই সংগ্রাম শেষে শুক্রবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর ফেরা হলো না। এখন পরিবারের একমাত্র চাওয়া, প্রিয় পুলকের নিথর দেহটি যেন অন্তত শেষবারের মতো মায়ের কোলে ফিরে আসে।

এ বিষয়ে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক বলেন, দূতাবাসের মাধ্যমে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা যাবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে তা করা হবে।