ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির উত্তাল সময়ের অন্যতম মুখ, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভোগার পর সোমবার (১ জুন) ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে এসে তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান। একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পরে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর চার প্রধানের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ দেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ৩৩ মাস কারাভোগের পর মুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সামনের সারির নেতা।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে ২০১৪ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০০৮ সালের পর গঠিত প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় তিনি স্থান পাননি। ২০১৮ সালের পরও মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয় তাকে।
জীবনের শেষভাগে রাজনৈতিক কোণঠাসা
একসময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হলেও জীবনের শেষভাগে দলীয় রাজনীতিতে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েন তোফায়েল আহমেদ। রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল।
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, আশির দশকের শেষদিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দলের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন ছিল বলে মনে করেন অনেকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন বক্তব্যেও শেখ হাসিনা সেই অসন্তোষের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা।
এছাড়া ২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তোফায়েল আহমেদ। সে সময় দলের ভেতরে সংস্কারের প্রস্তাব তোলায় তিনি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আব্দুর রাজ্জাক ও আমির হোসেন আমুকে নিয়ে আলাদা একটি বলয় তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই অবস্থান তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
যদিও তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং পরে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তবুও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার সক্রিয় ভূমিকা আগের মতো ছিল না। ঘনিষ্ঠজনদের মতে, রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত হওয়ার বিষয়টি তাকে ব্যক্তিগতভাবে হতাশ করেছিল।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট ও হতাশার মুখোমুখি হলেও তোফায়েল আহমেদ কখনো আদর্শচ্যুত হননি এবং রাজনৈতিক পথচলা থেকে সরে যাননি।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে ভূমিকা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সক্রিয় উপস্থিতির মধ্য দিয়ে তোফায়েল আহমেদ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম হয়ে থাকবেন।