কারও প্রয়োজন ক্যান্সারের জরুরি অস্ত্রোপচারের টাকা, কেউ লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব। স্বামী ও দুই সন্তান হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে এক মায়ের। আবার কাজের সন্ধানে দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রামে এসে কাজ না পেয়ে বাড়ি ফেরার ভাড়াটুকুও হারিয়েছেন এক ব্যক্তি। এমন নানা সংকট ও অসহায়ত্বের কথা নিয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সাপ্তাহিক গণশুনানিতে হাজির হয়েছেন ২৫ জন সেবাপ্রত্যাশী। অনলাইনে যুক্ত হয়ে জমি নিয়ে বিরোধ ও সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ জানিয়েছেন আরও চার প্রবাসী।
বুধবার (৪ নভেম্বর) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর থেকে আসা মানুষের অভাব-অভিযোগ ও আবেদন শোনেন জেলা প্রশাসক। এদিন অসুস্থ ও অসহায় ১২ ব্যক্তি এবং একজন শিক্ষার্থীসহ মোট ১৩ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গণশুনানিতে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক। কয়েকটি অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ও ফলাফল আবেদনকারীদের জানানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
গণশুনানিতে আসা মানুষের আবেদনপত্রে উঠে এসেছে অভাবের সঙ্গে লড়াই, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা আর স্বজন হারানোর বেদনার নানা গল্প।
বাঁশখালীর সরল গ্রামের মো. আব্দুল্লাহ প্রায় এক বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। গত ১৭ অক্টোবর চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর বাবা মো. ইদ্রিছ একজন কৃষক। ছয়-সাত সদস্যের সংসার চালিয়ে ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগানো তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ছেলের জীবন বাঁচানোর আশায় জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
পটিয়ার কেলিশহরের বরুন কুমার দে ২০২২ সাল থেকে লিভার ক্যান্সারে ভুগছেন। ভারত ও ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি কেমোথেরাপিও করিয়েছেন। এখন প্রয়োজন রেডিওথেরাপি। কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসায় সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ায় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।
লোহাগাড়ার মো. কফিল উদ্দীন দেওয়ানহাট দেওয়ানীয়া মসজিদের সহকারী পেশ ইমাম। গলার টিউমারে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় ভারতে চিকিৎসা নিতে চান তিনি। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নেই।
নগরের কাজির দেউড়ির সুলতান আহমদ সিকদার কিডনি, হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। তাঁর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রায় তিন লাখ টাকা। জমানো অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনিও সহায়তার আবেদন করেছেন।
বোয়ালখালীর আহলা গাজীপাড়ার দিনমজুর মো. আব্দুল গফুরের স্ত্রী বিবি জয়নাব দুই বছর ধরে গোদ রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। চিকিৎসকেরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন আব্দুল গফুর। অর্থাভাবে বন্ধ রয়েছে চিকিৎসা।
গণশুনানিতে জমা পড়া আবেদনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল সদরঘাটের পূর্ব মাদারবাড়ীর আয়েশা বেগমের আবেদন। কিডনি ও পাথরজনিত রোগে মারা গেছেন তাঁর স্বামী মনছুর উদ্দীন। পরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বড় ছেলে মো. আবুল কালাম আজাদ। গত বছরের ৩ মে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তাঁর আরেক ছেলেও।
এখন এক বিবাহযোগ্য মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। নিজেও অসুস্থ, কাজ করার সামর্থ্য নেই। আবেদনপত্রে তিনি জানিয়েছেন, কখনো অর্ধাহারে, কখনো অনাহারে দিন কাটছে তাঁদের। স্বামী ও দুই সন্তান হারানো এই নারী জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন।
নগরের আকবরশাহ এলাকার বেলি আক্তার ও সালমা বেগমের অবস্থাও করুণ। দুজনই বিধবা। স্বামী মারা যাওয়ার পর অন্যের বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে এখন আর কাজ করতে পারেন না। চিকিৎসা ও ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই তাঁদের।
বাঁশখালীর আসমা বেগমের স্বামী আট মাস ধরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। চার সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। স্বামীর বিরুদ্ধে করা মামলাটি মিথ্যা দাবি করে সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন আসমা।
অন্যদিকে, দিনাজপুরের এক ব্যক্তি কয়েক দিন আগে কাজের সন্ধানে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। কিন্তু কোথাও কাজ না পেয়ে হাতে থাকা টাকাও শেষ হয়ে গেছে। খাবারের ব্যবস্থাও নেই। বাড়ি ফেরার গাড়িভাড়াটুকু জোগাড় করতে শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
কারও প্রয়োজন কয়েক লাখ টাকার চিকিৎসা, কারও আবার বাড়ি ফেরার সামান্য ভাড়া। আবেদনগুলোর ধরন আলাদা হলেও সবার প্রত্যাশা একই—বিপদের দিনে একটু সহযোগিতা।
এদিকে, অনলাইনে গণশুনানিতে অংশ নেওয়া চার প্রবাসী জমি নিয়ে বিরোধ ও সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ তুলে ধরেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণশুনানিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কয়েকটি নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং ফলাফল সেবাপ্রত্যাশীদের জানাতে বলা হয়েছে।
মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সাপ্তাহিক গণশুনানি অসহায় মানুষের প্রশাসনের কাছে সরাসরি নিজেদের সংকট তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে। এদিন ১৩ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের অভিযোগ সমাধানেও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।