শিশুকে অপহরণ করে পা কেটে ভিক্ষায় নামাল চক্র,৭ মাস পর বাড়ি ফেরে,বেরিয়ে এল ভয়ংকর কাহিনী

স্লামডগ মিলিয়নারের দৃশ্য যেন বাস্তবে, শিশুর পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে!

বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘স্লামডগ মিলিয়নার’-এর সেই ভয়ংকর দৃশ্য যেন বাস্তবেই ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার নিখোঁজ শিশু রায়হানকে সাত মাস পর ফিরে পেয়েছেন তার বাবা। বাড়ি ফেরার পর শিশুটির কাছ থেকে বেরিয়ে এসেছে গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য—অপহরণ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তার পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করেছে।

রায়হান লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দিনের ছেলে।

রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, লোহাগাড়া থেকে প্রথমে ট্রাকে করে কক্সবাজার যায় সে। পরে এক ব্যক্তি তাকে নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ট্রেনের ছাদে করে ঢাকার কমলাপুরে নিয়ে যায়। সেখানে তিন সদস্যের একটি চক্রের হাতে বন্দি হয় সে।

রায়হান জানায়, তাকে প্রথমে চারদিকে বাগান এবং মাঝখানে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি ঘরে রাখা হয়। সেখানে আরও অনেক ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে ছিল। তাদের কারও হাত, কারও পা কাটা ছিল। কেউ পানি বিক্রি করত, আবার কেউ ভিক্ষা করত।

তার ভাষায়, ওই ঘরে দা, ছুরি ও ওষুধ রাখা ছিল। এক রাতে ঘুমিয়ে থাকার পর সকালে উঠে সে দেখতে পায় তার ডান পা কাটা। কীভাবে পা কাটা হয়েছে, সে কিছুই জানে না।

পরে চিকিৎসা করিয়ে তাকে কমলাপুর রেলস্টেশনে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। সারাক্ষণ তাকে নজরদারিতে রাখা হতো। মানুষের সহানুভূতি আদায়ের জন্য তাকে বিভিন্ন গল্প ও কৌশলও শেখানো হয়েছিল। তার উপার্জনের টাকা একটি ব্যাংকে জমা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানায় রায়হান।

রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন জানান, প্রায় সাত মাস আগে তার ছেলে নিখোঁজ হয়। পড়ালেখা না করে দুষ্টুমি করায় তাকে কাজে লাগিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। একদিন ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটাতে পাঠান। ৫০ টাকা খাওয়ার জন্য এবং বাকি ৫০ টাকা দিয়ে চুল কাটার কথা ছিল। কিন্তু সে ট্রাকে করে কক্সবাজার চলে যায়। সেখান থেকে এক ব্যক্তি তাকে কমলাপুর নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) চুনতির একটি মাহফিলে ছেলেকে দেখে একজন তাকে ফোন দেন। পরে খোঁজ নিয়ে রায়হানকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। ছেলের কাটা পা দেখে তিনি শিউরে ওঠেন।

নাজিম উদ্দিনের দাবি, তার ছেলে জানিয়েছে—চক্রটি বিভিন্নভাবে শিশুদের অঙ্গহানি করে ভিক্ষাবৃত্তি ও পানি বিক্রির কাজে ব্যবহার করছে।

লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ছোট্ট শিশুটির পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি করা হয়নি। তাদের ধারণা, শিশুটি সংঘবদ্ধ একটি চক্রের কবলে পড়েছিল। বিষয়টি রেলওয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।

তিনি আরও জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিশুটিকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে মানবাধিকার আইনবিদ অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান ঘটনাটিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, লোহাগাড়ার শিশুটির পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করার ঘটনা দেশে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। নিখোঁজ শিশুদের বড় একটি অংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।

অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, নিখোঁজ শিশুদের ভাগ্যে কী ঘটছে, তা সবসময় জানা যাচ্ছে না। তবে তাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া, ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা, মানুষের করুণা আদায়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি, পাচার ও নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, শিশুদের ঘুমের ওষুধ দিয়ে অচেতন করে, অসুস্থ সাজিয়ে কিংবা কোলের শিশু ভাড়া নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করার ঘটনাও দেখা গেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি পঙ্গু পথশিশুদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

রায়হানের ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের বেদনার গল্প নয়, বরং নিখোঁজ শিশুদের নিরাপত্তা এবং সংঘবদ্ধ শিশু পাচার ও ভিক্ষাবৃত্তি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।