স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অসুস্থ। কাজ করার সামর্থ্য নেই। ঘরে তিন শিশু সন্তান। স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ—সবকিছুর দায়িত্ব এসে পড়ে ইয়াসমিন আক্তারের কাঁধে। তবে প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি তিনি। ভাড়ায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে তিন সন্তানকে সঙ্গে করে রাস্তায় নেমেছেন ইয়াসমিন। সেই সংগ্রামের গল্প শুনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাপ্তাহিক গণশুনানিতে নিজেই অটোরিকশা চালিয়ে হাজির হন ইয়াসমিন। সেখানে জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরেন স্বামীর অসুস্থতা, সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসার চালানোর নানা সংকটের কথা।
ইয়াসমিনের কথা শুনে তাঁর সংগ্রামের প্রশংসা করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন ইয়াসমিন—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
ইয়াসমিনের প্রতি সম্মান জানাতে জেলা প্রশাসক তাঁর কার্যালয় থেকে নিচে নেমে অটোরিকশার পাশে দাঁড়িয়ে ছবিও তোলেন। পাশাপাশি স্বামীর চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন। তাঁকে চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী ও উপহার দেওয়া হয়। সন্তানদের পড়াশোনা যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও তাঁকে উৎসাহ দেন জেলা প্রশাসক।
সহায়তা পেয়ে ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার তিনটা ছেলে আছে। তিনটা ছেলেকে নিয়ে খাচ্ছি। উনি আমাকে চাল দিয়েছেন, কিছু টাকা-পয়সাও দিয়েছেন।’
গণশুনানিতে উঠে আসে আরও অনেক জীবনের গল্প
এদিনের গণশুনানিতে ইয়াসমিনের মতো আরও অনেক অসহায় মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা উঠে আসে। কেউ ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছেন না, কেউ সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিসের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আবার কেউ প্যারালাইসিসে কর্মক্ষমতা হারিয়ে চিকিৎসা ও সংসার চালাতে পারছেন না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাঁর বাবা দিনমজুর। পাঁচ সদস্যের পরিবারের ব্যয়ের পাশাপাশি ওমরের পড়াশোনা, যাতায়াত ও শিক্ষা উপকরণের খরচ বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিকূলতা জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে তাঁর উচ্চশিক্ষা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
ইফফাত জাহান ইশা দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত। সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি তিনি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপেও ভুগছেন। কর্মহীন বাবা আবদুর রহিম মেয়ের নিয়মিত চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পেরে সহায়তার আবেদন করেন।
কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত মো. নাজমুল হুদার অস্ত্রোপচারের পর চলছে কেমোথেরাপি। পাশাপাশি মৃগীরোগের চিকিৎসাও নিতে হচ্ছে তাঁকে। দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাঙ্গুনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল শুকুর দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা ও পঙ্গুত্বজনিত সমস্যায় ভুগছেন। নিয়মিত আয়ের উৎস না থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।
প্যারালাইসিসে থেমেছে উপার্জন
বাঁশখালীর মো. আবু তাহের প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন। শরীরের বাঁ পাশ অবশ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা কিংবা কাজ করতে পারেন না। উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।
পটিয়ার আজিজুল হক পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তিন ছেলে নিয়ে তাঁর সংসার। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের ভরণপোষণ ও নিজের চিকিৎসা—দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
একই এলাকার আবুল কাসেম চোখের রোগে আক্রান্ত। অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না।
পারুল বেগমের স্বামী দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। এক সন্তানও প্রতিবন্ধী। পারুল নিজেও কিডনি ও লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। পরিবারের ভরণপোষণ ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে তাঁকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হচ্ছে বলে আবেদনে উল্লেখ করেন।
মর্জিনা বেগমের স্বামীর হৃদ্যন্ত্রে অস্ত্রোপচার হয়েছে। চার মাস ধরে তিনি কাজ করতে পারছেন না। দুই মেয়ে ও এক ছেলের পরিবারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারে খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
হালিশহরের রোকছানা বেগমের স্বামী মারা গেছেন ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে। এরপর থেকে ছয় সন্তানকে নিয়ে একাই সংসার চালিয়ে আসছেন তিনি। সন্তানদের ভরণপোষণ করতে না পেরে তিনিও আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন।
২১ জনের কথা শুনলেন জেলা প্রশাসক
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বেলা ১১টায় শুরু হওয়া গণশুনানিতে সরাসরি ২১ জন সেবাপ্রত্যাশী অংশ নেন। চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জমিজমা, সম্পত্তি জবরদখলসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তাঁরা জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরেন। অনলাইনে একজন প্রবাসীও যুক্ত হয়ে অভিযোগ জানান।
অভিযোগগুলো শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে গৃহীত ব্যবস্থার ফলাফল আবেদনকারীকে জানাতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘একটি আবেদন গ্রহণের পর সেটি কোথায় গেল, কী সিদ্ধান্ত হলো এবং তার ফলাফল কী—সেবাপ্রত্যাশী যেন সেটি জানতে পারেন, সেটিও আমাদের দায়িত্ব।’
বুধবারের গণশুনানিতে কাগজে থাকা আবেদনগুলোর আড়াল থেকে সামনে আসে মানুষের জীবনের নানা সংকট—ক্যানসার, ডায়ালাইসিস, প্যারালাইসিস, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা কিংবা কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলার কষ্ট।
তবে সবার মধ্যে ইয়াসমিনের গল্পটি ছিল আলাদা। স্বামী অসুস্থ, ঘরে তিন সন্তান, সংসারে অভাব—তারপরও থেমে যাননি তিনি। অটোরিকশার হ্যান্ডেল ধরে নিজের শ্রমে পরিবারকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আর সেই সংগ্রামের কথা শুনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন জেলা প্রশাসক। স্বামীর চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি দিয়েছেন খাদ্যসামগ্রী ও উপহার। সবচেয়ে বড় কথা, তিন সন্তানের পড়াশোনা যেন থেমে না যায়—সেই সাহসও জুগিয়েছেন ইয়াসমিনকে।