শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়; এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সব স্তরের মানুষকে একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের ভাটেরখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ‘মাদকমুক্ত সমাজ, আমাদের অঙ্গীকার’ স্লোগানে উপজেলা প্রশাসন এ সমাবেশের আয়োজন করে।
জেলা প্রশাসক বলেন, “বিবেকবান মানুষের নীরবতা সমাজকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে মাদকের ভয়াবহতা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, সামাজিক প্রতিরোধই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি।”
তিনি বলেন, মাদকের বিস্তার সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। “আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখনই মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের কোনো সন্তান মাদক গ্রহণ করুক, তা হতে দেওয়া যায় না।”
মাদককে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে তিনি যে কোনো সময় খুন, চুরি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তাই সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে মাদকের বিস্তার রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে যেমন বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তেমনি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনিক অভিযান ও আইনের প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে। মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তথ্য দিন, আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। মাদকের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় নেই।”
অভিভাবকদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল বা সনদের জন্য নয়, একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যে সন্তান বাবা-মাকে সম্মান করে না, ছোটদের ভালোবাসে না এবং অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ায় না, তার শিক্ষাগত সাফল্য সমাজের কোনো উপকারে আসে না।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সময়ের মূল্য বুঝে মেধা ও দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হতে হবে। “সময় কিনে পাওয়া যায় না। মাদকের পেছনে সময় নষ্ট করলে যোগ্যতা অর্জন কিংবা সুস্থভাবে চিন্তা করা সম্ভব নয়।”
শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের সামনে আদর্শ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, শুধু মাদক থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিলেই হবে না; অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এমনভাবে চলতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম তাঁদের অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
তিনি আরও বলেন, মাদকের প্রতি সামাজিক ঘৃণা তৈরির পাশাপাশি ভালোবাসা, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। বড় অনুষ্ঠান, সাউন্ডবক্স বা প্যান্ডেল দিয়ে কোনো এলাকাকে মাদকমুক্ত করা যাবে না; বরং এলাকায় একজনও মাদকসেবী বা মাদক ব্যবসায়ী না থাকলেই সেই উদ্যোগের সফলতা আসবে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম, ভাটেরখীল উচ্চবিদ্যালয়ের সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এজহারুল ইসলাম, সমাজসেবক মো. শহিদুল ইসলাম এবং ছাত্র প্রতিনিধি সাজ্জাদ সাকিল।
এর আগে জেলা প্রশাসক উপজেলা পরিষদের সম্মেলনকক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে তিনি সততা, স্বচ্ছতা ও জনভোগান্তি কমিয়ে সরকারি সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
পরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সামাজিক অনুদান, হুইলচেয়ার, গাছের চারা, শিক্ষা ও ক্রীড়াসামগ্রী, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপকরণ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বেঞ্চ বিতরণ করা হয়।
সফরের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসক সীতাকুণ্ড মডেল থানা, অস্ত্রাগার ও উপজেলা ভূমি কার্যালয় পরিদর্শন করেন এবং সেবাপ্রার্থীদের দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।