রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই দুই মামাতো ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তাঁরা রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন।
পুলিশের দাবি, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। বিষয়টি গণপতি দেখে ফেলায় তাঁদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এরপর তাঁকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
পরে সিঁড়িতে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর মাস্টার্সপড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী এবং সবশেষে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, চারজনকে হত্যার পরও অভিযুক্তরা ওই বাড়িতেই রাত কাটায় বলে পুলিশের দাবি। পরদিন সকালে গোসল ও খাওয়া শেষে তারা বাড়ি থেকে স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পাশের একটি পরিত্যক্ত জায়গায় মাটির নিচে পুঁতে রাখে।
শনিবার রাতে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গণপতির মরদেহ পাওয়া যায় ছাদে, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছিল সিঁড়িতে এবং ছেলে প্রিয়মের মরদেহ পাওয়া যায় খাটের নিচে। প্রাথমিকভাবে তাঁদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। নিহত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাতের পর পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। শনিবার রাতে বাড়িতে গিয়ে বাইরে থেকে তালা দেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে দরজা খুলে একে একে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তদন্তের শুরুতে ঘটনাটিকে ডাকাতি বলে সন্দেহ করেছিল পুলিশ। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, ঘর তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায় এবং স্বর্ণালঙ্কার রাখার স্থানও ভাঙা ছিল। স্বজনদের পক্ষ থেকেও বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির বিরোধের কথা বলা হয়েছিল।
তবে পরবর্তী তদন্তে ইয়াবা সেবনের দৃশ্য দেখে ফেলা এবং পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকেই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে সামনে আনে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার দুজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তবে হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, লুট করা স্বর্ণালঙ্কারের সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক কতটুকু এবং হত্যার পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব বিষয় তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে চারজনকে হত্যার ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন।
একটি পরিবারের চারজন মানুষ—অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে ও স্কুলপড়ুয়া ছেলে—এক রাতেই প্রাণ হারালেন। হত্যার পরও ঘাতকদের বাড়িতে রাত কাটানোর অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
তবে পুলিশের দাবি করা এসব তথ্যের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।