পানি নামতেই চট্টগ্রামে ভয়াবহ ভাঙন, ঝুঁকিতে শতাধিক জনপদ

চট্টগ্রামে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও বেড়েছে নদী ও খালের তীরভাঙন। নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও তীরবর্তী জনপদ হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে হাজারো মানুষের। প্রথম দফার বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পর দ্বিতীয় দফায় শুরু হওয়া ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলা ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়। বন্যার পানির তীব্র স্রোতে বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদী-খালের তীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পানি কমার পর ভাঙন বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। সে অনুযায়ী প্রাথমিক প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খ ম জুলফিকার তারেক বলেন, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ এবং নদী-খালের তীর ভেঙে গেছে। এখন পানি নামার সঙ্গে নতুন করে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু করা হবে।

সরকারি হিসাবে এবারের বন্যায় চট্টগ্রামে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ পানিবন্দী ছিলেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২৬৯টি স্থানে ভাঙন হয়েছে। এতে প্রায় ২২ দশমিক ১০৭ কিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ভাঙন মেরামত ও সংস্কারে প্রায় ১৫১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ভাঙনের শিকার হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। সরল, বাহারছড়া, কাথারিয়া, শেখেরখীল, চাম্বল, সাধনপুর, শীলকূপ, ছনুয়া ও গণ্ডামারাসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া সাঙ্গু নদী, জলকদর খাল, সোনাইছড়ি খাল, সরকার খাল ও রাজাখালেও তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।

সাতকানিয়ার সাঙ্গু, ডলু নদী ও কাটাখালী খালের তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রাম এবং লোহাগাড়ার সরদানীপাড়া, কলাউজান, আমিরাবাদ, উত্তর পদুয়া ও চরম্বা এলাকার বিভিন্ন স্থানে নদী ও খালের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। হালদা নদী ও ধুরং খালের তীরেও ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। পটিয়া উপজেলার চান্দখালী, হারগাজী, খরণা খাল, ধলঘাট, আশিয়া, শোভনদণ্ডী, কচুয়াই ও কোলাগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব স্থানে বাঁধ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সেখানে দ্রুত সংযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ করা হবে। পাশাপাশি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জরুরি সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হবে। স্থায়ী সমাধানের জন্য অতিভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন প্রকল্পও গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে রাঙামাটি বিভাগের আওতায় কর্ণফুলী, ইছামতি, শিলক, কাপ্তাই হ্রদ, সত্তাখাল, ডাবুয়া খাল, বোয়ালখালী খাল ও রায়খালী খালসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০২টি ভাঙনস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানের প্রায় ৮ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মেরামতে প্রায় ৪২ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে পওর-১ বিভাগের আওতায় ৭৪টি এবং পওর-২ বিভাগের আওতায় ৯৩টি ভাঙনস্থল শনাক্ত করা হয়েছে। এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারে যথাক্রমে প্রায় ২৩ কোটি ও ৮৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

বন্যার পানি কমলেও নদী ও খালের তীরভাঙন অব্যাহত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।