একটি কোলের উষ্ণতায় ঈদের আনন্দ: ছোটমনি নিবাসে মানবিক ডিসির নিঃশব্দ ভালোবাসা
নতুন টাকা, নতুন জামা, সুস্বাদু ফল—আর এক বিশ্বস্ত কোল। পবিত্র ঈদের আনন্দ কেমন হতে পারে, তার এক নিঃশব্দ অথচ গভীর প্রকাশ দেখা গেল চট্টগ্রামের রউফাবাদ এলাকার সরকারি ছোটমনি নিবাসে।
শনিবার (২১ মার্চ) ঈদের সকালে এই নিবাসে হাজির হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। আনুষ্ঠানিকতা দূরে রেখে, একেবারে সহজ মানুষ হিসেবেই তিনি প্রবেশ করেন শিশুদের ছোট্ট এই আশ্রয়ে। সঙ্গে ছিল নতুন জামা, ফলমূল ও ঝকঝকে নতুন নোট—ঈদের উপহার।
প্রথমে কিছুটা সংকোচে থাকলেও ধীরে ধীরে শিশুদের মুখে ফুটে ওঠে হাসি। কেউ হাত বাড়িয়ে নেয় ঈদের সালামি, কেউ আবার নতুন জামা হাতে নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। ছোট ছোট হাতে ধরা নতুন নোট যেন শুধু অর্থ নয়, তাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি—তাদেরও ঈদ আছে।
তবে দিনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় যখন জেলা প্রশাসক নিজ হাতে শিশুদের কোলে তুলে নেন। একটি ছোট্ট শিশুকে কোলে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে তার ভরসা ফিরে আসে। কিছুক্ষণ পর আরেকটি শিশুকে তুলে নেন তিনি—ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানার মানব পাচার মামলার আসামির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া দুই মাস বয়সী ইয়াসীন।
দুটি শিশুকে বুকে আগলে রাখার সেই দৃশ্য যেন পুরো ঘরে এক নীরব আবেগ ছড়িয়ে দেয়।
এই শিশুদের জীবন গল্প ভিন্ন হলেও বেদনার জায়গাটি এক। কেউ জন্মের পরই হারিয়েছে পরিবার, কেউ উদ্ধার হয়েছে অন্ধকার বাস্তবতা থেকে। মানব পাচার মামলার ভিকটিম ইসরাত জাহান রক্সির শিশু সন্তান ইশা আক্তারকে গত বছরের ১ জুন এই নিবাসে আনা হয়। জন্মদাতার পরিচয় না জানা এই শিশুটি আদালতের নির্দেশনায় এখানে বেড়ে উঠছে। অন্যদিকে, মাত্র দুই মাস বয়সে উদ্ধার হওয়া ইয়াসীনের জীবনও শুরু হয়েছে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে।
ছোটমনি নিবাসের অফিস সহকারী নূর জাহান আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, “অনেকেই আসেন, কিন্তু এভাবে সময় দেন না। ঈদের দিন পরিবার ছেড়ে এখানে এসে শিশুদের কোলে নেওয়া—এটা আমরা আগে কখনো দেখি নাই।”
নিবাসের অন্যপ্রান্তে তখন উৎসবের আমেজ—কেউ নতুন জামা পরার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, কেউ ফলের টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে। তবুও কোথাও যেন এক নীরব প্রশ্ন ভেসে বেড়ায়—“আমার আপনজন কোথায়?”
বর্তমানে ছোটমনি নিবাসে ১৬ জন শিশু রয়েছে। অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও এখানে তারা নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন শিখছে—যত্নে, শৃঙ্খলায় এবং ভালোবাসায়।
ঈদের এই দিনে নতুন জামা বা টাকার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি দৃশ্য—একটি কোল, যেখানে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।
যেখানে একজন প্রশাসক ও এক শিশু—দুজনেই হয়ে ওঠে শুধুই মানুষ।
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.