সাজেকে সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সমঝোতা হয়নি,গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সশস্ত্র সন্তু লারমা গ্রুপের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারি প্রতিনিধি দল প্রতিশ্রুতি দিতে না পারায় সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে বৈঠক। ফলে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে সাজেক ইউনিয়নের উজো বাজারে দুই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা আলোচনায় সাজেকবাসীর উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে পুনরায় বৈঠকের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
বৈঠকে সাজেকবাসীর পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি লিখিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ২২ অক্টোবর অবরোধকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি, অভিযোগে নাম আসা সেনা কর্মকর্তাদের শাস্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলি, দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
এ ছাড়া আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ, উজো বাজার থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যদের প্রত্যাহার এবং সাজেক থেকে সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়। আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধের পাশাপাশি তাঁদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি না চালানোর দাবিও তুলে ধরা হয়।
সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিতে সময় চায় সরকার
বৈঠকে সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারি প্রতিনিধি দল তিন সপ্তাহ সময় চায় বলে জানিয়েছে দুই সংগঠন। তবে সংগঠন দুটির নেতারা এতে সম্মত হননি। তাঁরা সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের মধ্যে সশস্ত্র সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে ওই সময়ের মধ্যে তাদের সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রয়োজনে সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তাঁরা।
দাবিগুলো নিয়ে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানান সংগঠন দুটির নেতারা।
বৈঠকে সাজেকবাসীর প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের উষাতন চাকমা, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির জিকো চাকমা এবং সাজেক নারী সমাজের সদস্য সাধনা দেবী চাকমা।
অন্যদিকে সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা ছিলেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি, খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোর্তজা আলী খান এবং রাঙামাটির পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রকিব।
সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ
বৈঠকে লিখিত দাবি উপস্থাপনের সময় সাজেকের চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন দুই সংগঠনের নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, গত ৩১ আগস্ট সাজেকের রুইলুই পর্যটন কেন্দ্রের পাশের দাড়িআদাম গ্রাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা গ্রুপের একটি সশস্ত্র দল গাড়িতে করে পর্যটন সড়ক দিয়ে এসে মাচালং সেনা ক্যাম্পের পাশে অবস্থান নেয়। এরপর থেকে দলটির সদস্যরা বিভিন্ন গ্রামে সশস্ত্র তৎপরতা চালানো, মৃত্যুর হুমকি ও গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং জুমচাষিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
তাঁদের দাবি, ওই দলের গুলিতে কস্মিতা ত্রিপুরা নামে নয় বছর বয়সী এক শিশু আহত হয়। এ ছাড়া জুমচাষিদের কাছ থেকে প্রতি আড়ি জুমের জন্য এক হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। ধান মাড়াইয়ের মেশিন, হলুদ গুঁড়া করার মেশিন ও ইঞ্জিনচালিত বোট থেকেও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তোলেন তাঁরা।
সংগঠন দুটির নেতাদের আরও অভিযোগ, সশস্ত্র দলের সদস্যরা বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছেন এবং গ্রামবাসীর চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছেন। বর্তমানে তাঁরা ভূয়োছড়ি গ্রামের দশবল বৌদ্ধবিহারের মাঠে বাংকার খুঁড়ে অবস্থান করছেন বলেও দাবি করেন তাঁরা। এতে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায় ভিক্ষু ও উপাসক-উপাসিকাদের অসুবিধা হচ্ছে বলে জানান সংগঠনের নেতারা।
তাঁদের ভাষ্য, সশস্ত্র দলের সদস্যদের মাচালং সেনা ক্যাম্পের কাছাকাছি বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সামরিক প্রশাসনের কাছে বারবার দাবি জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
২২ অক্টোবর হামলার অভিযোগ, মামলা প্রত্যাহারের দাবি
সংগঠন দুটির নেতারা জানান, সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন তাঁরা। পরে স্থানীয় সেনা কর্তৃপক্ষের অনুরোধে দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। নির্ধারিত সময়ে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় ১৫ অক্টোবর থেকে আবার অবরোধ শুরু হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে কর্মসূচি ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রেখে ২২ অক্টোবর থেকে পুনরায় অবরোধ শুরু করা হয়।
তাঁদের অভিযোগ, ২২ অক্টোবরের শান্তিপূর্ণ অবরোধ চলাকালে পর্যটকদের বিষয়ে আলোচনা করার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের ওপর লাঠিচার্জ করেন এবং গুলি ছোড়েন। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে উজো বাজারের দোকান ও বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় এবং অনেকে আহত হন বলেও দাবি করেন তাঁরা।
এ ঘটনায় ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও এক হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন সংগঠন দুটির নেতারা। পাশাপাশি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থী ঝরণা চাকমাকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেন, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো অপরাধ হতে পারে না। তাঁদের অভিযোগ, সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও মামলা করা হয়েছে। এ অবস্থায় দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানান তাঁরা।
বৈঠকে উত্থাপিত অভিযোগ ও বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দেওয়া। এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারি প্রতিনিধি দলের পৃথক বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.