গ্রাম আদালত হতে পারে জনগণের আস্থার ভিত্তি: চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে সরকারি সেবার মান উন্নয়ন এবং জন-প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। জনগণ যাতে সহজে, দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে সেবা পায়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যতম দায়িত্ব। গ্রাম আদালত হতে পারে সেই আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
মঙ্গলবার (৯ জুন) নগরীর পিটিআই সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘গ্রাম আদালত কার্যক্রমের অগ্রগতি ও করণীয়’ শীর্ষক জেলা পর্যায়ের অর্ধ-বার্ষিক সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্প’-এর আওতায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের আয়োজনে সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) গোলাম মোহাম্মদ মইনুদ্দিন। এতে জেলার ১৫টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি), ১৯১টি ইউনিয়নের ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহযোগী সংস্থা ইপসা’র পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন) নাছিম বানু শ্যামলী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের চট্টগ্রাম জেলা ব্যবস্থাপক সাজেদুল ইসলাম আনোয়ার ভূঁইয়া।
জেলা প্রশাসক বলেন, “আমরা বছরের পর বছর সভা-সেমিনারে অংশ নিই, নানা পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যান উপস্থাপন করি। কিন্তু নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—বাস্তবে আমরা কতটুকু পরিবর্তন আনতে পেরেছি? জনগণ কি আমাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে?”
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কাছ থেকে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রত্যেকের উচিত নিজ কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা আরও বলেন, “আমরা প্রায়ই অন্যের ভুল খুঁজি, কিন্তু নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি কি না, সেই আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে কমে গেছে। অথচ দেশ ও সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব আমাদেরই ওপর ন্যস্ত।”
তিনি জানান, প্রতি বুধবার গণশুনানিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের অভিযোগ ও সমস্যার কথা নিয়ে আসেন। অনেক সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধান করা সম্ভব হলেও দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতার অভাবে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
গ্রাম আদালতের গুরুত্ব তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, দেশে উচ্চ ও নিম্ন আদালত মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে আদালতের ওপর চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
তিনি বলেন, “গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সহজ, দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে বিচারসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত একটি সফল উদ্যোগ। এই কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক অংশগ্রহণ।”
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, “আপনার কাছে যে নাগরিকটি সেবা নিতে আসে, সে যেন কাঙ্ক্ষিত সেবা নিয়ে ফিরে যেতে পারে। আপনার কর্মস্থলকে সেবার সুবাসে ও মানবিকতার সৌরভে ভরিয়ে তুলুন।”
সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক গোলাম মোহাম্মদ মইনুদ্দিন গ্রাম আদালত প্রকল্পের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গ্রাম আদালতের সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইতিবাচক ও সেবামুখী মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাম আদালত সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচার-প্রচারণা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম আদালত কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। যেসব ইউনিয়নে মামলার সংখ্যা শূন্য বা অত্যন্ত কম, বিশেষ করে মিরসরাইয়ের কয়েকটি ইউনিয়নের উদাহরণ তুলে ধরে সেখানে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আস্থা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ এবং গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এছাড়া ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মামলার নথি, রেজিস্টার ও প্রশাসনিক কার্যক্রম যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। গ্রাম আদালতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.