সংকটে অর্থনীতি, বিনিয়োগে ব্রেক—নির্বাচনের পর ২০২৬-এ ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় ব্যবসায়ীরা

দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগের মন্দা পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং তা আরও তীব্র হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ভোক্তার চাহিদা কমে যাওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানি হ্রাস ও জ্বালানি সংকট—সব মিলিয়ে বেসরকারি খাত কার্যত চাপে পড়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদায়ী বছরটি ছিল মূলত টিকে থাকার লড়াই। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে অর্থনীতির এই গুমোট পরিস্থিতি কাটতে শুরু করবে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। অথচ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সেই অনুপাতে না বাড়ায় পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যবসা পরিচালনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণনীতির কারণে বিশেষ করে এসএমই ও নতুন উদ্যোক্তারা অর্থায়নে বড় বাধার মুখে পড়ছেন। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও দুর্বল সুশাসনের কারণে ব্যবসায়িক আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে বন্দরের অদক্ষতা, লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের ধীরগতি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
সরকারের পর্যবেক্ষণেও অর্থনীতির এই সংকট উঠে এসেছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে গেছে, সুদের হার বৃদ্ধির ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহ হচ্ছেন। এতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ শতাংশে। একই সময়ে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ০.৭৬ শতাংশ, শিল্পে ২.৪৪ শতাংশ এবং সেবায় ২.৪১ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতিতে ইতিবাচকের তুলনায় নেতিবাচক দিকই বেশি ভারী। সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবায়নে অগ্রগতি সীমিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যাংকঋণের সুদ এখন ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধক। ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকলেও বাজারে ডলারের সংকট কাটেনি। এর সঙ্গে নতুন করে চাঁদাবাজি ও শ্রমিক অসন্তোষ শিল্পাঞ্চলগুলোকে অস্থির করে তুলছে।
মূল্যস্ফীতির চাপে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান শিফট কমাচ্ছে, কেউ কেউ সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখতেও বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষভাবে সংকটে পড়েছে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাত। প্রায় ৭৮ লাখ সিএমএসএমই দেশের জিডিপির এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখে এবং মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এই খাতে যুক্ত। কিন্তু উচ্চ সুদ ও ঋণসংকটে তাদের বড় অংশই এখন অস্তিত্ব সংকটে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.২৩ শতাংশ, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার হার কমেছে ২০ শতাংশের বেশি।
রপ্তানি খাতেও স্বস্তি নেই। টানা চার মাস ধরে রপ্তানি কমছে। নভেম্বর মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩৮৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৫৪ শতাংশ কম।
তবে এসব হতাশার মধ্যেও ব্যবসায়ীরা আশার আলো দেখছেন ২০২৬ সালকে ঘিরে। এফবিসিসিআই ও ডিসিসিআই নেতাদের মতে, নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, ঝুলে থাকা বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হবে এবং অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ২০২৫ সাল ছিল একটি ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে ব্যবসাবান্ধব নীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যাংক খাত সংস্কার ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করা সম্ভব হবে—এই আশাতেই তাকিয়ে আছেন দেশের উদ্যোক্তারা।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.