নিউজ:
কারাগারে বন্দীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা স্বজনদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘবে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁর আগ্রহ ও উদ্যোগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে চালু হয়েছে ওয়ান-টু-ওয়ান ইন্টারকম টেলিফোন ব্যবস্থা, যার ফলে বন্দী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এখন আর গ্রিলের দুই পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন না।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেবার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম।
এতদিন কারাগারের সাক্ষাৎ কক্ষে গ্রিলের এপাশে স্বজন আর ওপাশে বন্দী—মাঝখানে লোহার ফাঁক ও অসহনীয় শব্দের ভিড়ে কে কী বলছে তা বোঝা ছিল কঠিন। ফলে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ কথাও ঠিকমতো বলা বা শোনা যেত না। নতুন ইন্টারকম ব্যবস্থায় সেই দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে।
কারা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ। দেশের কারাগারগুলোতে ইন্টারকম ব্যবস্থার এটি দ্বিতীয় উদ্যোগ হলেও একসঙ্গে ৩২টি বুথ স্থাপন করে এত বড় পরিসরে প্রথমবারের মতো এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে।
নতুন ব্যবস্থায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বন্দীদের স্বজনরা। হত্যা মামলায় প্রায় এক বছর ধরে বন্দী খুলশির আমবাগান এলাকার দেলোয়ার হোসেন বাবুলের সঙ্গে দেখা করতে এসে তাঁর স্ত্রী রুমা আক্তার বলেন, “ছেলেটা আজ বাবার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পেরেছে। এইটুকুই আমাদের জন্য অনেক।”
বাবুলের বন্ধু মো. সাইফুল হোসেন বলেন, “আগে কিছুই বুঝতাম না। আমরা কী বলছি, ভেতর থেকে কী বলছে—সব শব্দের মধ্যে হারিয়ে যেত। আজ ইন্টারকমে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বললাম।”
রাজনৈতিক মামলায় বন্দী হালিশহরের মো. শাহাদাৎ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে এসে তাঁর ভাই মো. আব্বাস উদ্দিন বলেন, “এতদিন গলা ফাটিয়ে কথা বলতে হতো। আজ শান্তিতে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি।”
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৬ হাজার ৪৫৫ জন বন্দী রয়েছেন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক স্বজন সাক্ষাতে আসেন। ভিড় ও শব্দের কারণে এতদিন অনেকেই ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না।
তিনি বলেন, “আমি নিজেও কথা বলে দেখেছি—একটি ছোট শিশু তার বাবার সঙ্গে কথা বলছে। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার আদালত করবে। কিন্তু বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা তো অপরাধী নন। কারাগারে অবস্থানকালে আমরা যতটুকু সম্ভব মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই।”
কারা অধিদপ্তরের অনুমোদনে আলহাজ্ব শামসুল হক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে নিচতলায় দুই পাশে ১৬টি করে মোট ৩২টি ইন্টারকম স্থাপন করা হয়েছে—এর মধ্যে ১২টি পুরুষ ও ৪টি মহিলা বন্দীদের জন্য বরাদ্দ। পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় তলাতেও এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “এখন আর চিৎকার করে কথা বলতে হবে না। সারাদেশের কারাগারের মধ্যে চট্টগ্রাম কারাগারেই প্রথম এত বড় পরিসরে এই ব্যবস্থা চালু হলো।”
ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে বন্দীদের সঙ্গে অনলাইনে সাক্ষাৎ বা ভিডিও কলে কথা বলার ব্যবস্থাও চালু হতে পারে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
কারাগার মানেই শুধু শাস্তির স্থান নয়—মানবিক ব্যবস্থাপনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। গ্রিলের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আজ যারা স্বচ্ছ কণ্ঠে কথা বলতে পেরেছেন, তাদের অভিজ্ঞতাই বলছে—প্রশাসনের একটি মানবিক সিদ্ধান্ত অনেক দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে।