জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ভূমিকা, গণভোটের গুরুত্ব এবং নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সংকট নিয়ে “সদস্য নির্বাচনে গণভোট” শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ।
সভায় উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল লক্ষ্য একটি ভেঙে পড়া রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করা এবং জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের মতামত উপেক্ষিত হলে এবং রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে গণতন্ত্রকে তার প্রকৃত জায়গায় ফিরিয়ে আনতেই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো নিরপেক্ষ কাঠামো নয়; বরং এটি জনগণের পক্ষে এবং বিশেষভাবে কাঠামোগতভাবে বঞ্চিত নারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতি থেকে নারীদের ঝরে পড়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও ক্ষমতাগত বৈষম্যের ফল। সামাজিক আন্দোলন ও সংগ্রামে নারীরা নেতৃত্বের প্রমাণ রাখলেও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এসে তাদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, দলগুলোর মানসিকতা এখনো একটি সংকীর্ণ ধারার মধ্যে আবদ্ধ, যার ফলে নারীর নেতৃত্ব দলীয়ভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে না। অনেক নারী দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যা রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উপদেষ্টা জানান, বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো দলই তা পূরণ করতে পারেনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৫২ শতাংশ নারী হলেও যদি তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র কীভাবে অর্থবহ হতে পারে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে মোট ২৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪ থেকে ৪.৫ শতাংশ, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রায় ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থীই দেয়নি, যা নির্বাচন কমিশন ও রাষ্ট্রের নীতিগত অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা প্রসঙ্গে শারমীন এস মুরশিদ বলেন, নারী প্রার্থী ও নারী ভোটারদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে সরাসরি মাঠে কাজ করবে। এ লক্ষ্যে আগামী ১৭ জানুয়ারি ‘কুইক রেসপন্স টিম’ উদ্বোধন করা হবে। এই টিমের প্রশিক্ষিত ভলান্টিয়াররা ২৪ ঘণ্টা মাঠে থেকে নারী প্রার্থী ও নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং যেকোনো হয়রানি বা সহিংসতার ঘটনায় তাৎক্ষণিক সহায়তা দেবে।
সভায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিনাত আরা এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও উন্নয়নকর্মী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বক্তব্য দেন। এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী প্রার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শেষাংশে উপদেষ্টা উপস্থিত নারী প্রার্থীদের সংগ্রামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, এই আলোচনার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করতে হবে এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে।