আনোয়ারা উপকূলে আবারও সক্রিয় চিহ্নিত মাদক সিন্ডিকেট, সাগরপথে ডুকতেছে ইয়াবা ও মদ

১৩৩

আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক:

জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু সময় নীরব থাকলেও চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে চিহ্নিত মাদক কারবারিরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সাগরপথে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক এনে আনোয়ারার বিভিন্ন উপকূলীয় পয়েন্টে খালাস করা হচ্ছে। পরে কর্ণফুলী টানেল ও কর্ণফুলী সেতু ব্যবহার করে এসব মাদক চট্টগ্রাম নগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা থেকে মাছ ধরার ট্রলারের মাধ্যমে ইয়াবা এনে আনোয়ারার পারকি, ফুলতল, গহিরা, প্যারাবন ও ভরাচরসহ বিভিন্ন উপকূলীয় পয়েন্টে খালাস করা হয়। এরপর সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়িতে করে মাদক বিভিন্ন গন্তব্যে সরিয়ে নেয়।

গত এক বছরে আনোয়ারা ও আশপাশের এলাকায় র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও পুলিশের একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের চুন্নাপাড়া এলাকা থেকে সেনাবাহিনী প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের ২ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় দুই ভাই মো. আব্দুল্লাহ আল নোমান (২৫) ও মো. আবু হানিফ (২২) গ্রেপ্তার হন।

এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রায়পুরের দক্ষিণ পরুয়াপাড়ায় র‌্যাব-৭-এর অভিযানে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ ইয়াবাসহ মনোয়ারা বেগম নামে এক নারী গ্রেপ্তার হন। একই বছরের ১৭ নভেম্বর বৈরাগ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর এলাকায় ২ হাজার ৯৫০ পিস ইয়াবাসহ মো. ইব্রাহিম (২৫)কে আটক করে পুলিশ। এছাড়া চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের অভিযানে প্রায় ৯৩ লাখ টাকা মূল্যের ৩০ হাজার ৯২৫ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে আটক করা হয়।

স্থানীয়দের দাবি, একসময় আনোয়ারার উপকূলীয় বেল্টের জুঁইদণ্ডী, রায়পুর ও বারশত এলাকার কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধির ছত্রচ্ছায়ায় মাদক চোরাচালান পরিচালিত হতো। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর নতুন প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে আবারও সক্রিয় হয়েছে মাদক সিন্ডিকেট। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিংবা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয়দের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, পাঁচ আগস্টের পর চোরাকারবারীরা নতুন করে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তারা আনোয়ারা ও পতেঙ্গার বহির্নোঙর এলাকায় মাদক ও বিদেশি মদ খালাস করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ জুন দিবাগত রাত ২টার দিকে পতেঙ্গা থানার চরপাড়া ঘাট সংলগ্ন এলাকায় কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযানে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে অবৈধভাবে খালাস করা প্রায় ৫৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা মূল্যের ১ হাজার ৭৬৫ ক্যান বিদেশি বিয়ার, ৭৪ বোতল ভদকা, ৮৮ বোতল হুইস্কি এবং ৪ হাজার ৮০০ শলাকা বিদেশি সিগারেট জব্দ করা হয়। তবে কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে জড়িতরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, “মাদক কারবারিরা আবার সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে থানা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

র‌্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এআরএম মোজাফফর হোসেন বলেন, “আনোয়ারাকে ব্যবহার করে সাগরপথে ইয়াবা পাচারের বিষয়ে র‌্যাব সতর্ক রয়েছে। ইয়াবা নির্মূলে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি এবং এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, স্থায়ীভাবে মাদক চোরাচালান বন্ধ করতে হলে সীমান্ত ও উপকূলজুড়ে সমন্বিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং মাদক সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.