ডিসি জাহিদের গণশুনানি দেশ থেকে প্রবাসে: ভিডিও কলে অভিযোগ, সরাসরি শুনানিতে সহায়তা পেলেন অসহায়রা

প্রবাসীদের সম্পত্তি ও পরিবারের নিরাপত্তা–সংক্রান্ত অভিযোগ থেকে শুরু করে অসুস্থ, দরিদ্র ও বিপদগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের আবেদন—সবই একদিনে সরাসরি শুনলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। বুধবার (৩ জুন) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পৃথক দুটি গণশুনানিতে দেশ ও প্রবাসের মানুষের নানা সমস্যা তুলে ধরা হয় এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

দিনের প্রথম ভাগে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রবাসী গণশুনানি’। এতে দুবাই, আবুধাবি ও কাতার থেকে কয়েকজন প্রবাসী জুম প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে তাঁদের অভিযোগ তুলে ধরেন। পাশাপাশি বর্তমানে দেশে অবস্থানরত দুজন প্রবাসীও সশরীরে অংশ নেন।

দুবাইপ্রবাসী আবুল খালেক অভিযোগ করেন, পটিয়ায় তাঁর পরিবারের সদস্যরা ছিনতাই, নির্যাতন ও হুমকির শিকার হচ্ছেন। আবুধাবিপ্রবাসী রাজু মুহুরী জমিজমা–সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ করেন। দুবাইপ্রবাসী মোহাম্মদ হারুন বোয়ালখালীতে পরিবারের সদস্যদের হয়রানি ও হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেন।

এদিকে আবুধাবিপ্রবাসী সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, হাটহাজারীতে তাঁর সম্পত্তি জবরদখলের চেষ্টা, নির্মাণকাজে বাধা, চাঁদাবাজি এবং পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে আবুধাবিপ্রবাসী মোরশেদ আলম বিদেশে উপার্জিত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে প্রশাসনের সহযোগিতা চান। কাতারপ্রবাসী নুরুল হাকিম তালেকও তাঁর এক আত্মীয়ের বিরুদ্ধে প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে ধরেন।

প্রতিটি অভিযোগ শুনে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি অভিযোগগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রবাসী গণশুনানি শেষে সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর এলাকা থেকে আসা ২৫ জন সেবাপ্রত্যাশী তাঁদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও চিকিৎসাজনিত সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

গণশুনানিতে জেলা প্রশাসকের এলএ শাখার প্রয়াত চেইনম্যান মো. ফোরকানের স্ত্রী জেসমিন আরা বেগম তিন সন্তান নিয়ে মানবিক সহায়তার আবেদন জানান। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গোপনীয় শাখার কর্মচারী মোহাম্মদ আলী তাঁর ছেলে আরিয়ানের জরুরি অস্ত্রোপচারের ব্যয়ভার বহনে সহায়তা চান। চট্টগ্রাম জেলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় মো. তানভীর হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পর অস্ত্রোপচারের জন্য আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত কানু মজুমদার, স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যায় ভোগা জান্নাতুল আক্তার, মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের বকেয়া ফি পরিশোধে সংকটে থাকা ক্রীড়া সংগঠক কামাল আহমেদ এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রত্যাশী আবু রায়হানসহ আরও কয়েকজন তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

শুনানি শেষে গুরুতর অসুস্থ আটজন ব্যক্তিকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক। আবেদনকারীদের কাছে অগ্রগতি ও ফলাফল জানাতেও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসী ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য চালু হওয়া এই গণশুনানি কার্যক্রম প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন সমস্যাগুলো দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

একই দিনে অনুষ্ঠিত দুই গণশুনানিতে দেশের বাইরে থাকা প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি–সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং দেশের ভেতরে অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও সামাজিক সংকটে থাকা মানুষের বাস্তব চিত্র উঠে আসে। অভিযোগ ও আবেদন সরাসরি শুনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে জেলা প্রশাসনের জনমুখী ও মানবিক সেবার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.